চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৯১ শতাংশ। আবার এ সময়ে বাংলাদেশের অনুকূলে বিদেশী ঋণের অর্থ যে পরিমাণে ছাড় হয়েছে, ঋণ ও ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে তার চেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে এমন চিত্র উঠে এসেছে। যদিও নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর স্বল্প ব্যয়ের বিদেশী ঋণ পাওয়ার মাত্রা বাড়বে বলে প্রত্যাশা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণ প্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধ বেশি হওয়ায় তা রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় নতুন ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আবার সরকারের পক্ষ থেকেও বিদেশী ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম দূর করে প্রকল্প প্রস্তুতের কাজ এখনো শেষ করা যায়নি। আর বাজেট সহায়তা বাবদ পাওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর অর্থ ছাড় হয়ে তা হিসাবে যুক্ত হতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ইআরডির তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ৫২২ মিলিয়ন ডলারের। যদিও গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৫৯ মিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি কমেছে ৯১ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে কমেছে অর্থছাড়ের পরিমাণও। গত জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত দেশে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ১ হাজার ৫৪৩ মিলিয়ন ডলারের। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণছাড় হয়েছিল ২ হাজার ১১৭ মিলিয়ন ডলার। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণছাড় কমেছে ২৭ শতাংশের বেশি।
বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমার পেছনে দেশে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির বিষয়টি কাজ করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের ভাষ্যমতে, জুলাই আন্দোলনের পর বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে দেশ। তাই নতুন প্রকল্প অনুমোদন বা প্রস্তুতে বাড়তি সময় লাগছে।
এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্দোলনসহ নানা কারণে অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি উন্নয়নকাজে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। আমাদের দেশে বিদেশী সহায়তার বড় অংশই প্রকল্প ঋণ। কিন্তু সরকারি বড় পরিবর্তনের ফলে ঘর গোছাতেই অনেক সময় লেগেছে। অতীতের অনিয়ম যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে গিয়েও সময় লেগে যাচ্ছে। নতুন প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা বা অনুমোদন দেয়া সম্ভব হয়নি। তাই ঋণ প্রতিশ্রুতিও কমেছে। তবে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকে কিছু বাজেট সহায়তা আসবে। সেগুলো তাদের বোর্ডে অনুমোদন পেতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’
সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের গতি কমে আসায় অর্থছাড়ও কমেছে বলছেন বিশ্লেষকরা। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর উন্নয়ন বরাদ্দ কাটছাঁট করার কাজ করছে। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, সংশোধিত উন্নয়ন পরিকল্পনায় বরাদ্দ কমতে পারে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যানুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। যেখানে গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে জুলাই-নভেম্বরে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩৪ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
এদিকে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমলেও অর্থ পরিশোধ বাড়ছে। এমনকি গত কয়েক মাসে অর্থপ্রাপ্তির চেয়ে অর্থ পরিশোধের পরিমাণ ছিল বেশি।
ইআরডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১ হাজার ৭১১ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৩২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ২২ শতাংশের বেশি।
ঋণ প্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধের পরিমাণ বেশি হলে বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ পড়বে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। রিজার্ভে কিছুটা স্থিতিশীলতা আনার জন্য এসব বাড়তি চাপ নিয়ে ভাবতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই ঋণ প্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধ বেশি। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এবার কমে যাবে। আবার রূপপুরসহ বড় কয়েকটি প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হচ্ছে। তখন ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। তাই পুরনো প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময় বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা শুরু করা উচিত। আর নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক-সচেতন হতে হবে। রিজার্ভের ওপর যেন বেশি চাপ না পড়ে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।’
ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে সরকারের বিদেশী ঋণ পরিশোধ ৩ বিলিয়নের ঘরে থাকলেও চলতি অর্থবছরে তা ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কারণ গত অর্থবছরে বিদেশী ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, সুদ বাবদ ব্যয় বেড়েছে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে।